মুন্সীগঞ্জ জেনারেল হাসপাতাল এখন দালালদের দখলে!

mghশেখ মো. রতন: মুন্সীগঞ্জের ১০০ শয্যা জেনারেল হাসপাতালটি এখন ক্লিনিক-ডায়াগনস্টিক সেন্টারের নিয়োগকৃত দালালদের দখলে। তাদের নিয়ন্ত্রণ করছে হাসপাতালের চতুর্থ শ্রেনীর কর্মকর্তা ও জেলা বিএমএ’র সভাপতি ডা: আক্তার হোসেন বাপ্পি। অতি-সম্প্রতি হাসপাতালের ভিতরে বহিরাগত কোন ক্লিনিক-ডায়াগনস্টিক সেন্টারের দালাল প্রবেশ করা সম্পূর্ন নিষেধ করে দিয়েছিলেন জেলার সিভিল সার্জন মো: শরিফুল আলম। গোটা কয়েকদিন দালালবিহীন হাসপাতালটির চেহারা ভালই লাগছিল। এর এক সপ্তাহ যেতে না যেতে দালালভর্তি কালো বিভৎষ্য হাসপাতালের চেহারাটি আবার উন্মোচিত হলো।

সিভিল সার্জনের করা নির্দেশ থাকা সত্তেও ক্লিনিক-ডায়াগনস্টিক সেন্টারের মালিকদের মোটা টাকায় পকেট ভারি করে মুখ বন্ধ করে রেখেছে সিভিল সার্জন। এখন হাসপাতালের ভিতরের প্রতিটি ডাক্তারের রুমে দেখা যায় লাল-নীল-হলুদ রংয়ের বোরখা পড়া নারী দালালদের। আর খোদ ক্লিনিক-ডায়াগনস্টিক সেন্টারের মালিকরা এখন পুরুষ দালালদের ভূমিকা রাখছেন। এ হাসপাতালটির প্রধান ফটক থেকে শুরু করে ইনডোর ও আউটডোরে সকাল থেকে রাত পর্যন্ত এসব দালালদের জন্য ভিতরে প্রবেশ করা মুশকিল হয়ে পরেছে সাধারণ রোগীদের।
mgh
সরেজমিনে বৃহস্পতিবার সকালে জেনারেল হাসপাতালে গিয়ে দেখা গেছে, রোগীর চেয়ে দালাল বেশি-এমনটাই উদাহরন দিয়ে দালারদের দ্বারা প্রতারিত ভূক্তভূগী ৮০ বছরের বৃদ্ধা জৈনক জাহানারা বেগম বলেন,-আমরাতো বাহে গরিব মানুষ, বাচুম আর কয়দিন, ৫ টাকা দিয়া টিকেট কাইটা ডাক্তার দেখাইয়া শেষ করতে না করতে বোরখা পড়া এক মাইয়া আমারে টাইন্না লইয়া গেল হাসপাতালের সামনে মেডিল্যাব নামের একটা রক্ত-পরিক্ষা সেন্টারে। ওই খানে আমার লগে কোন কথা না কইয়াই রক্ত-প্রসাব নিয়া একটা কাগজ ধরাইয়া দিয়া ২ হাজার টাকা হইছে কইয়া সব টাকা রাইখা দিল আব্দুল হাই নামের ওই ল্যাবের মালিক। সাথে থাকা সব টাকা ওই ডায়াগনোস্টিক মালিক নিয়ে যাওয়ার পর ওষূধ কেনার টাকা না থাকায় অশ্র“ঝড়া মুখে কাঁদতে-কাঁদতে চলে যেতে বাধ্য হয় ওই বৃদ্ধা। এমন ঘটনা প্রতিনিয়ত ঘটছে এ হাসপাতালে। কত জাহানারাকে সর্বশান্ত করেছে এসব দালালরা যা সরেজমিনে গিয়ে না দেখলে বলা মুশকিল।

এদিকে, জেনারেল হাসপাতালের প্রধান ফটকের সামনেই গড়ে উঠেছে ১০-১২ টি ডায়াগনোস্টিক সেন্টার ও প্রাইভেট ক্লিনিক। এগুলোর নামগুলো হচ্ছে, রেনেসা ডায়াগনস্টিক সেন্টার, মেডিল্যাব ডায়াগনস্টিক সেন্টার, লাইফ ডায়াগনস্টিক সেন্টার, মডার্ন ডায়াগনস্টিক সেন্টার, নিউ পপুলার ডায়াগনস্টিক সেন্টার, স্বপ্ননীড় ডায়াগনস্টিক সেন্টার, এ প্লাস ডায়াগনস্টিক সেন্টার, মোল্লা ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টার, ডক্টরস ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টার, স্কয়ার ডায়াগনস্টিক সেন্টার, এ আর ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারসহ সরকারি জেনারেল হাসপাতালের আশেপাশে যত্রতত্র ব্যাংঙ্গের ছাতার মতো গড়ে উঠেছে আরো অনেক ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টার। এগুলোর মধ্যে মেডিল্যাব ও রেনেসা ডায়াগনোস্টিক সেন্টারের মালিক হাসপাতালের আউটডোরের ডাক্তার কামরুল করিম, ডা: মোস্তাফিজুর রহমান, ডা: তোফাজ্জল হোসেন এবং বিএমএ’র সভাপতি ডা: আক্তার হোসেন বাপ্পি ও জেলা সিভিল সার্জন মো: শরিফুল আলমকে মোটা অংকের টাকা দিয়ে ম্যানেজ করে দিব্বি দালালী ব্যাবসা করে যাচ্ছেন।

সরেজমিনে আরো জানা গেছে, জেনারেল হাসপাতালটিতে অনেক ডাক্তার শূন্য থাকায় রোগীদের সীমাহীন দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে। প্রায় ছয় মাস ধরে অর্থোপেডিক্স বিভাগ ডাক্তার নেই। চক্ষু বিভাগে ডাক্তার নেই চার মাস । মেডিসিন বিভাগ ডাক্তার শুন্য প্রায় ৮ বছর। শিশু কনসালটেন্ট ডা: আশরাফুলকেই দেখতে হয় মেডিসিন বিভাগ ও ইনডোরের ভর্তি রোগিদের। এমনকি আলটাসনোগ্রাফির ডাক্তারটিও নেই চার মাস যাবৎ। বির্হিবিভাগের মেডিকেল অফিসারদের মধ্যে পর্যাপ্ত পরিমানে ডাক্তার নেই বলে রোগীদের দীর্ঘ সময় লাইনে দারিয়ে থাকতে হয়।

টঙ্গীবাড়ি উপজেলার চরবেসনাল থেকে আসা রোগী মতিয়া বেগম (৫৫) বলেন, চিকিৎসার দরকার তাই ভর্তি হয়ে নিচে শুয়ে আছি। এ রোগীদের দিকে খেয়াল করার যেনো কেউ নেই। এসব অব্যবস্থাপনার কারনে অনেক রোগীকে তার স্বজনরা হাসপাতাল থেকে নিয়ে যায় বেসরকারি ক্লিনিকে। হাসপাতালের কেবিন এবং জেনারেল বেডের বাথরুম সবকটিই অপরিষ্কার, টয়লেট ও পানির কল নষ্ট থাকায় আরও বেশী দুর্ভোগ পোহাতে হয় রোগীদের। বাহিরের চাপ কল দুটি প্রায়ই নষ্ট থাকায় রোগীরা খাবারের পানিও ঠিক মতো পায় না। হাসপাতালের বেডগুলোর অধিকাংশই ভাঙ্গা এবং যেসব বেডগুলো কোন রকম ঠিক আছে, তার আবার বিছানা নেই। যার কারণে রোগীদের বেডে শুতে অসুবিধা হয়। বেডের অভাবে রোগীদের ফ্লোরে থাকতে হয় নিজস্ব বিছানা পেতে। জনবলের অভাবে পরিস্কার পরিচ্ছন্নতাও সঠিক ভাবে হয়না। ওয়ার্ডের সবকটি লাইটও জলেনা, অধিকাংশ ফ্যান নষ্ট। এতে হাসপাতালের ভেতরের অধিকাংশ জায়গাই অন্ধকারে থাকে। নাই কোন দারোয়ান। নাই কোন পাহারাদার। হাসপাতালটার দিকে তাকালে মনে হয় সে নিজেই রোগী। নতুন সিভিল সার্জন আসার পরে গাইনী বিভাগটা অনেক উন্নতি হয়েছে। কিন্তু উন্নতি হয়নি আউটডোর-ইনডোর।

ওষুধ কোম্পানি ও ক্লিনিক দালালরা সকাল থেকে রাত পর্যন্ত ডাক্তারের পাশে থেকে রোগী টানা হেচঁরা করছে। ওষুধ কোম্পানির (ফুড সাপ্লিমেন্ট) দালালরা ইমারজেন্সি সহ ইনডোরে সকাল-রাতঅব্দি ডাক্তার নার্সদের সাথে থেকে হলুদ খামের উপঢৌকন দিয়ে তাদের নাম বিহীন ওষুধ লেখাচ্ছেন। যা এখন যেন দেখার কেও নেই। কারণ ডাক্তার-নার্সরা এখন নিজেরাই তাদের আশ্রয়-প্রশ্রয় দিচ্ছেন। তার মধ্যে যদি জড়িত থাকে হাসপাতালের স্টাফ-নার্স ও খোদ সিভিল সার্জন তবে আর কথাই থাকে না।

এসব বিষয়ের সত্যতা স্বীকার করে সিভিল সার্জন মো: শরিফুল আলম বলেন, জেনারেল হাসপাতালে এখন রোগীর চেয়ে দালাল বেশি। হাসপাতালের চতুর্থ শ্রেনীর কর্মচারীদের দায়ীত্ব দেয়া হয়েছিল দালালদের ভিতরে প্রবেশ করতে না দিতে। তারা এখন সম্পূর্ন ব্যর্থ। তাই প্রশাসনের মাধ্যমে আনসার-পুলিশ দিয়ে প্রতিদিন দালাল মুক্ত করবো। আসা রাখি দুই এক দিনের মধ্যে হাসপাতালে আর ডায়াগনোস্টিক সেন্টারের নিয়োগকৃত কোন দালাল থাকবে না। ওষুধ কোম্পানির কোন দালাররা যেন ডাক্তার-নার্সরা আশ্রয়-প্রশ্রয় না দেয় সে ব্যাপারে জরুরী ভিত্তিতে ব্যবস্থা নেয়া হবে।

এটিএনবিডি

Leave a Reply