আব্দুল্লাহ আল মাসুদ: ঘুষ, দুর্নীতি, নিয়োগ বাণিজ্য ও অর্থ আত্মসাতের একাধিক অভিযোগের মধ্যেই ইসলামিক ফাউন্ডেশনের মুন্সিগঞ্জ জেলা কার্যালয়ের উপপরিচালক (চলতি দায়িত্ব) মো. শাহাবুদ্দীনকে বদলি করা হয়েছে। তাঁকে জেলা কার্যালয়ের দায়িত্ব থেকে সরিয়ে ইসলামিক ফাউন্ডেশনের সিলেট বিভাগীয় কার্যালয়ে সহকারী পরিচালক হিসেবে পদায়ন করা হয়েছে।
সম্প্রতি ইসলামিক ফাউন্ডেশনের প্রশাসন বিভাগ থেকে জারি করা এক অফিস আদেশে এ তথ্য জানানো হয়। উপসচিব মো. গোলাম কবির স্বাক্ষরিত ওই আদেশে আগামী ২৬ জুলাইয়ের মধ্যে বর্তমান কর্মস্থলের দায়িত্ব বুঝিয়ে দিয়ে নতুন কর্মস্থলে যোগদানের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। Reference
এর আগে মুন্সিগঞ্জে ভুয়া বা জাল সনদ, বার্ধক্যজনিত অক্ষমতা এবং পবিত্র কোরআন তিলাওয়াতে অদক্ষতাসহ বিভিন্ন কারণে অযোগ্য ঘোষিত ২০ জন শিক্ষককে পুনর্বহাল করার ঘটনায় জেলা কার্যালয় ও প্রকল্প-সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে ব্যাপক সমালোচনার সৃষ্টি হয়। ওই ঘটনাকে কেন্দ্র করে জেলা কার্যালয়ের বিভিন্ন অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ প্রকাশ্যে আসে।

অভিযোগ রয়েছে, নতুন নিয়োগপ্রাপ্ত শিক্ষকদের বই বিতরণ, বেতন খাতায় স্বাক্ষর ও অন্যান্য প্রশাসনিক কার্যক্রম একই সঙ্গে সম্পন্ন করা হলেও বেতন প্রদানে বৈষম্য করা হয়। ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, কাউকে ৩০ হাজার টাকা এবং অধিকাংশকে ২৪ হাজার টাকা দেওয়া হয়। কয়েকজন শিক্ষক অভিযোগ করেন, যেসব শিক্ষক সংশ্লিষ্ট কেয়ারটেকারদের মাধ্যমে অতিরিক্ত তিন থেকে ছয় হাজার টাকা দিতে রাজি হন, কেবল তাঁদের হিসাবেই ৩০ হাজার টাকা জমা হয়। অন্যদের ২৪ হাজার টাকা দেওয়া হয় এবং তাঁদের কাছ থেকে অতিরিক্ত অর্থ নেওয়া হয়নি।
প্রকল্প-সংশ্লিষ্ট একাধিক ব্যক্তি, ভুক্তভোগী শিক্ষক ও সংশ্লিষ্ট সূত্রের অভিযোগ, ২০২৫ সালের মাঝামাঝি সময়ে মুন্সিগঞ্জে যোগদানের পর থেকেই মো. শাহাবুদ্দীন তাঁর অধীনস্থ ফিল্ড অফিসার মুজাহিদুল ইসলাম, ফিল্ড সুপারভাইজার মোস্তফা কামাল ও রুবেল মিয়া (যাঁরা দীর্ঘ ১৫-১৬ বছর ধরে একই জেলায় কর্মরত) এবং কেয়ারটেকার মিরাজ, ওমর ফারুক, জামালুদ্দিন, হাফিজুর রহমান ও কামরুজ্জামানসহ কয়েকজনকে নিয়ে একটি সিন্ডিকেট গড়ে তোলেন। তাঁদের বিরুদ্ধে মসজিদভিত্তিক শিশু ও গণশিক্ষা কার্যক্রমে শিক্ষক নিয়োগ, অযোগ্য শিক্ষকদের পুনর্বহাল, রসিদবিহীন যাকাত ও বই বিক্রির নামে অর্থ আদায় এবং বেতন-ভাতাসহ বিভিন্ন খাতে অনিয়ম ও আর্থিক লেনদেনের অভিযোগ রয়েছে।
লিখিত অভিযোগে বলা হয়েছে, ২০২৫ সালের শেষ দিকে শিক্ষক যাচাই-বাছাই কার্যক্রমে সুবিধা পাইয়ে দেওয়ার আশ্বাস দিয়ে বিপুলসংখ্যক শিক্ষকের কাছ থেকে জনপ্রতি পাঁচ হাজার টাকা করে আদায় করা হয়। এছাড়া যাচাই-বাছাইয়ে অযোগ্য ঘোষিত শিক্ষকদের পুনর্বহাল এবং বকেয়া ভাতা পাইয়ে দেওয়ার নামে জনপ্রতি ২০ হাজার টাকা নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। নতুন শিক্ষক নিয়োগের ক্ষেত্রেও ২০ থেকে ৩০ হাজার টাকা পর্যন্ত ঘুষ দাবি করা হতো বলে অভিযোগ। টাকার পরিমাণ শুনে অনেকে আবেদনই করেননি। টাকা দিতে অস্বীকৃতি জানালে শিক্ষা কেন্দ্র বন্ধ করে দেওয়ার হুমকি দেওয়া হয়েছে বলেও অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।
অভিযোগে আরও বলা হয়েছে, জেলার প্রায় ৮০০ শিক্ষকের কাছ থেকে যাকাতের নামে রসিদ ছাড়া অর্থ সংগ্রহ, বই বিক্রির নামে অর্থ আদায়, নতুন শিক্ষকদের বেতনের একটি অংশ ফেরত নেওয়ার চেষ্টা এবং মডেল শিক্ষক নিয়োগে আর্থিক অনিয়ম করা হয়েছে। এসব অভিযোগের সমর্থনে বিভিন্ন নথিপত্র, শিক্ষকদের স্বাক্ষরসংবলিত তালিকা ও অন্যান্য তথ্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে জমা দেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগকারীরা দাবি করেছেন।
এ ছাড়া কয়েকজন ফিল্ড সুপারভাইজার ও কেয়ারটেকারের বিরুদ্ধেও ঘুষ আদায়, অর্থ আত্মসাৎ এবং শিক্ষকদের ভয়ভীতি প্রদর্শনের অভিযোগ আনা হয়েছে। অভিযোগকারীদের দাবি, দীর্ঘদিন ধরে একটি সংঘবদ্ধ চক্র এসব অনিয়ম চালিয়ে আসছিল।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে একাধিক শিক্ষক ।, দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন অজুহাতে তাঁদের কাছ থেকে টাকা নেওয়া হতো। কখনো যাচাই-বাছাই, কখনো অন্য কারণ দেখিয়ে অর্থ দাবি করা হতো। টাকা না দিলে বিভিন্নভাবে চাপ সৃষ্টি করা হতো। অনেক সময় বেতন আটকে রাখা বা কেটে দেওয়ার ভয় দেখানো হতো। আবার কারও কারও ক্ষেত্রে অতিরিক্ত দেওয়া টাকা ফেরত দেওয়ার জন্যও চাপ সৃষ্টি করা হয়েছে। এসব কারণে দীর্ঘদিন ধরে তাঁরা মানসিক চাপে দায়িত্ব পালন করেছেন। তাঁরা অভিযোগগুলোর নিরপেক্ষ তদন্ত এবং সত্যতা মিললে দায়ীদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানান।
সিরাজদীখান উপজেলার আলহেরা মাদ্রাসার সুপার মাওলানা আব্দুল জলিল বলেন, মো. শাহাবুদ্দীন মুন্সিগঞ্জে যোগদানের পর থেকেই তাঁর বিরুদ্ধে বিভিন্ন অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ ধারাবাহিকভাবে উঠে এসেছে। অভিযোগগুলোর নিরপেক্ষ তদন্ত করে প্রকৃত ঘটনা উদঘাটন এবং অভিযোগ প্রমাণিত হলে তাঁর বিরুদ্ধে আইনানুগ ও দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা উচিত। একই সঙ্গে এসব অনিয়মের সঙ্গে জড়িত অন্যদের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন।
অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে ইসলামিক ফাউন্ডেশনের মুন্সিগঞ্জ জেলা কার্যালয়ের উপপরিচালক মো. শাহাবুদ্দীন বলেন, আমার দায়িত্ব পালনকালে কোনো ধরনের অনিয়ম বা দুর্নীতি হয়নি। একজন ফিল্ড সুপারভাইজারের বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠেছিল। পরে তিনি এখান থেকে চলে যান। তাঁর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ আমি পাইনি। এছাড়া আমি শিক্ষক ও সুপারভাইজারদের কাছে জানতে চেয়েছি, ঘুষ বা দুর্নীতির কোনো ঘটনা ঘটেছে কি না। তাঁরা আমাকে জানিয়েছেন, এ ধরনের কোনো ঘটনা ঘটেনি। তাই অভিযোগে যেভাবে আমার সম্পৃক্ততার কথা বলা হচ্ছে, তার সঙ্গে আমার কোনো সংশ্লিষ্টতা নেই।
সময়ের কন্ঠস্বর

Leave a Reply